একাত্তরের অনন্য সাংস্কৃতিক যুদ্ধ


আমার কোন হাতটা তুমি শেকলে
বাঁধতে চাও?
চৌদ্দ কোটি হাত রয়েছে!
আমার কোন মাথাটা ধড় থেকে
নামাতে চাও?
রয়েছে সাত কোটি মাথা!

[বাংলাদেশ: কাইফি আজমি, ভালোবাসায় বাড়ানো হাত, পৃষ্ঠা: ৩২-৩৩]

গেল শতাব্দীর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির নিয়তি অনেকটাই নির্ধারিত হয়ে যায়। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার লড়াই তাকে ক্রমশ নতুন রাজধানীর পথে ধাবিত করে। মাতৃভাষা বাংলার মুক্তি ক্রমশ বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষা, গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার সংগ্রামের দিকে নিয়ে যায়। কেননা পূর্ব বাংলার বঞ্চিত জনগণের অধিকার, পঞ্চাশ ও ষাট দশকের আন্দোলন শেষ নাগাদ গিয়ে ঠেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। সেই সময়ের স্বাধীনতাকামী বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের অপর এক স্বর্ণালি ইতিহাসের অনন্য অধ্যায়কে সামনে এনেছেন বরেণ্য সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও লেখক মতিউর রহমান। কী সেই অনন্য ইতিহাসের অধ্যায়?

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে নানা মাত্রার যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। তন্মধ্যে সামনাসামনি যুদ্ধের বাইরে স্বাধীনতার পক্ষে বড় মাত্রা যোগ করছিল দেশ-বিদেশের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। আর সেই সাংস্কৃতিক যুদ্ধের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে লেখক ও সাংবাদিক মতিউর রহমানের ভালোবাসায় বাড়ানো হাত গ্রন্থে। লেখক নিজেও একাত্তরের উত্তাল সময়ের একজন রাজনীতিক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক যোদ্ধা। এবং ছিলেন মুক্তিকামী সমর-ময়দানের মানুষের দলের একজন সাহসী কর্মী। ফলে লেখকের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, নিজের দেখা, সংগঠিত করা, লড়াইয়ের ময়দানে অভিজ্ঞতার আলোকে বইটি লিখেছেন এবং বিশ্লেষণ করেছেন। লেখার ক্ষেত্রে তিনি সংবেদনশীল থেকেছেন। ইতিহাসের দায় মিটিয়েছেন। এখানে উল্লেখযোগ্য দিকভালোবাসায় বাড়ানো হাত বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য মুক্তিযুদ্ধে দেশ-বিদেশের লেখক-শিল্পীদের স্বতন্ত্র ও বলিষ্ঠ ভূমিকার ইতিহাস। প্রশ্ন হচ্ছেকী আছে ভালোবাসায় বাড়ানো হাত গ্রন্থে?

নয় পর্বে ভাগ করা ভালোবাসায় বাড়ানো হাত গ্রন্থটি। প্রথম পর্বে আছে—‘লেখকের কথা: তাঁদের আমরা ভুলব না শিরোনামের ভূমিকা। লেখক জানাচ্ছেন—‘একাত্তরে দেশের অভ্যন্তরে বা সাহায্যকারী প্রতিবেশী দেশ ভারতে বাংলাদেশের সাহসী সংস্কৃতিসেবীরা যখন তাঁদের সব শ্রম দিয়ে অনুপ্রেরণা সৃষ্টির কাজ করে যাচ্ছেন, তখন আমরা দেখি, আন্তর্জাতিক পরিসরেও দেশে দেশে বিশ্বনন্দিত শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি বা গায়কেরা একইভাবে আমাদের স্বাধীনতার সমর্থনে মহতী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁরা কবিতা পাঠ করে, কনসার্টে গান গেয়ে, ছবি এঁকে এবং সংহতি আন্দোলন গড়ে তুলে আমাদের মহাবিপর্যয়ের দিনগুলোতে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। গ্রন্থটির শিরোনামের মাহাত্ম্য এখানেইমহাবিপর্যয়ের সময় যাঁরা পাশে এসে দাঁড়ান, সমর্থন জোগান, সহযোগিতা করেন, ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেন, তাঁরাই প্রকৃত-মহৎ বন্ধু। ফলে গ্রন্থের শিরোনাম জুতসই। কেননা তিনি আবেগের সঙ্গে যুক্ত করেছেন অনুসন্ধিৎসু বিশ্লেষণ, নানা তথ্য-উপাত্ত, ইতিহাসের অনুসন্ধান, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অনুপুঙ্খ পটভূমি।

ভালোবাসায় বাড়ানো হাত বইয়ের প্রথম পর্ব কলকাতার লেখক-শিল্পীদের ভূমিকা। প্রবন্ধে লেখক একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কলকাতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, লেখক, গায়ক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মীরা কী ভূমিকা পালন করেছেন, তার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। এমনকি তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের ক্ষেত্রে লেখক নির্মোহ থেকেছেন। তিনি লিখেছেন, ২৫ ও ২৬ মার্চের গণহত্যার সংবাদ প্রকাশিত হলে কলকাতার লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বও সজাগ ও উদ্যোগী হয়ে ওঠে। একাত্তরের কালক্রমিক ঘটনাপ্রবাহের বয়ানের ক্ষেত্রে লেখক বিশেষ জোর দিয়েছেন বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী-লেখক-বুদ্ধিজীবী সমিতি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সহায়ক সমিতি, আইপিটিএসিপিআই-এর ভূমিকা, নিরঙ্কুশ সহায়তা ও সমর্থনের কথা। লেখকের বয়ানে স্পষ্টবাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সকল উদ্যোগের পেছনে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে বামপন্থী লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা। শুধু বাংলাভাষী লেখক বুদ্ধিজীবী নন, বাংলাদেশের পক্ষে সে সময় লড়েছেন উর্দুভাষী কবি, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরাও। লেখক তুলেছেন কাইফি আজমির সেই বিখ্যাত কবিতা বাংলাদেশ। নিজেদের সর্বস্ব নিয়ে তাঁরাও দাঁড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের পাশে।

গ্রন্থটির শিরোনামের মাহাত্ম্য এখানেইমহাবিপর্যয়ের সময় যাঁরা পাশে এসে দাঁড়ান, সমর্থন জোগান, সহযোগিতা করেন, ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেন, তাঁরাই প্রকৃত-মহৎ বন্ধু। ফলে গ্রন্থের শিরোনাম জুতসই। কেননা তিনি আবেগের সঙ্গে যুক্ত করেছেন অনুসন্ধিৎসু বিশ্লেষণ, নানা তথ্য-উপাত্ত, ইতিহাসের অনুসন্ধান, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অনুপুঙ্খ পটভূমি...

গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বের নাম বোম্বের শিল্পীদের স্মরণীয় অবদান। মূলত মহারাষ্ট্রের বাংলাদেশ সহায়ক কমিটির নানা পদক্ষেপ ও অনুষ্ঠানের ঘটনাবলি বিধৃত হয়েছে এই পর্বে। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের সমর্থনে একাত্তরের ২৩ এপ্রিল এই কমিটি গঠিত হয়। লেখক মতিউর রহমান জানান—‘মহারাষ্ট্রের বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির বহুমুখী বড় বড় কাজে এ রাজ্যের লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা ৯ মাসজুড়েই সক্রিয় ছিলেন। এই পর্বে লেখক উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনার বয়ান দেন, যুদ্ধাক্রান্ত বাংলাদেশের মানুষের জন্য সমাজকর্মী মৃন্ময়ী বোস অর্থ সংগ্রহের জন্য বোম্বে যান। সেখানে কিংবদন্তি গীতিকার সলিল চৌধুরীর সহায়তায় বাংলাদেশের রিলিফের আশায় বিশ্ববিখ্যাত সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকরের বাসায় যান। লতাজিকে ঘটনা বলার পর সঙ্গে সঙ্গে ১ লাখ রুপির একটা চেক দেন। নিজের কিছু রেকর্ডও দেন। এবং বলেছিলেন, যত দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের এই যুদ্ধ চলবে, তত দিন এর রয়্যালটি এই ফাণ্ডে যাবে। সত্যিকারার্থে এমন উদারতা পৃথিবীতে বিরল। এই ঘটনা এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তও বটে। লেখকের মতে, শুধু বোম্বে নয়, সারা ভারতবর্ষ যেন সে সময় বাংলাদেশে পরিণত হয়েছিল।

শুধু ভারতবর্ষ নয়, দুনিয়ার দেশে দেশে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনেও হয়েছিল সংহতি সমাবেশ ও কুটনৈতিক তৎপরতা। তৃতীয় পর্বে আছে লাতিন আমেরিকার লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন জুগিয়েছিল, তার বিস্তৃত বর্ণনা আছে। তৃতীয় পর্বের নাম মিছিলের সামনে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। সকলে জানবেন, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো আর্জেন্টাইন লেখক, বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্য সমালোচক। একাত্তরে তিনি আর্জেন্টাইন অসংখ্য লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, সমাজকর্মী ও ধর্মীয় নেতাদের সমবেত করেন। তাঁরা সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দাবি তোলেন বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য সাহায্য পাঠানোর। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সে সময় ওকাম্পোর নেতৃত্বে এক স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন খ্যাতিমান সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেস, এদুয়ার্দো সাবাতো, এদোলপো ওবোইতাসহ অসংখ্য বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী ও সামাজিক নেতা। লেখক ভারতীয় কূটনীতিক শিবনাথ রায়ের বরাতে লিখেছেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসার কথা। ওকাম্পো তাঁকে [শিবনাথ রায়] বলেছেন, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি আমার সমর্থন স্বাভাবিক। কারণ, বাংলাদেশের মানুষের ভাষা বাংলা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষাও বাংলা। বইয়ে উল্লেখ আছে, ভেনেজুয়েলাতে বাংলাদেশের সাহায্যার্থে একই রকম বিবৃতি দেন লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা।

ভালোবাসায় বাড়ানো হাত গ্রন্থের চতুর্থ পর্বে আছে মার্কিন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী জোয়ান বায়েজের দ্য স্টোরি অব বাংলাদেশে গানটির কথা। বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের নৃশংস বর্বর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি গানটি লিখেছিলেন। গানের সুরও নিজে করেছেন। জোয়ানের গানটি বেশ কয়েকটি অ্যালবামে সং অব বাংলাদেশ নামে অন্তর্ভুক্ত হয়। মতিউর রহমানের মতে, সেই প্রথম শোনার পর এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ দশক ধরে বহুবার শুনলেও এই অবিস্মরণীয় গান আজও পুরোনো হয়নি। এখনো এ গান একাত্তরের সেই দিনগুলোতে টেনে নিয়ে যায়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ওপর শোনা গানগুলোর মধ্যে জোয়ান বায়েজের গানটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ। লেখক এ পর্বে শ্রীনাথ রাঘবনের ১৯৭১: আ গ্লোবাল হিস্টোরি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ গ্রন্থের স্মরণ নিয়েছেন। সেই সূত্রে লিখেছেনগানটি ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে এবং তারপর মিশিগান ইউনিভার্সিটির কনসার্টেও গাওয়া হয়। লেখক জানান, জোয়ান বায়েসের গানের স্প্যানিশ সংস্করণ অ্যালবামের অর্থ বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য ইউনিসেফের তহবিলে দান করেন। তাঁর এই প্রবন্ধে প্রতিবাদী শিল্পী জোয়ান বায়েজের জীবনের নানা দিক নিয়েও আলোকপাত করা হয়।

সে সময়, ১৯৭১ সাল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলছে। তখন আমরা ছিলাম আগরতলায়, দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর কথা অল্পই জানতে পেরেছিলাম। দেশ স্বাধীন হলে যখন দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ সম্পর্কে আরও জানতে পারি, তখন গভীর আবেগে আপ্লুত হয়েছিলাম, অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।’—পঞ্চম পর্বে এভাবেই কথাগুলো লিখলেন মতিউর রহমান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও আলোচিত কনসার্ট দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে অনুষ্ঠিত এই কনসার্টের প্রধান উদ্যোক্তা পণ্ডিত রবিশঙ্কর। তিনিই জর্জ হ্যারিসনকে উদ্বুদ্ধ করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমর্থন ও শরণার্থীদের সাহায্য করতে। সেই কনসার্টে গান গেয়েছিলেন জর্জ হ্যারিসন, জন লেনন, এরিক ক্ল্যাপটন, লিওন রাসেল, রিঙ্গো স্টার, ব্রিলি প্রেস্টনের মতো দুনিয়াজাদা সংগীতশিল্পী। এতে সেতার বাজিয়েছেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ আল্লারাখা তবলা আর ওস্তাদ আকবর আলী খাঁ সরোদ। সেখানে রবিশঙ্কর পল্লিগীতির আদলে নতুন বাংলা ধুন সৃষ্টি করেন। একাত্তরে ওই কনসার্ট বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে দুনিয়াজুড়ে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল।

বাঙালির দিক থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হলো জাতীয়তাবাদী মুক্তির সংগ্রাম, কিন্তু সেই সংগ্রাম পৃথিবীর দেশে দেশে উপনিবেশ বিরোধী সাংস্কৃতিক যুদ্ধে পর্যবসিত হয়। বস্তুত অপর ভাষার লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের এই লড়াই ছিল উপনিবেশ ও সাংস্কৃতিক মুক্তির এক অধ্যায়, অনন্য এক যুদ্ধ। যেন শিল্পের সব পথ মিলে যায় এক মানবিক পথের দিশায়। বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধের ময়দানে যেমন লড়েছেন, তাঁরাও লড়েছেন অন্যভাবে, কবিতা লেখা, পাঠ, সংগীত আর শিল্প সৃষ্টি ও পরিবেশনার ভেতর দিয়ে। এককথায় বলা যায়, ‘ভালোবাসায় বাড়ানো হাত’ বইটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসের নতুন সংযোজন। একই সঙ্গে বইয়ের তথ্য-উপাত্ত ভবিষ্যত ইতিহাস চর্চার পথকে আরও প্রশস্ত করবে।   

প্রবন্ধে মতিউর রহমান অনেক নতুন অনুসন্ধানী তথ্য ও ঘটনাবলি হাজির করেছেন। কীভাবে এই কনসার্ট সফল হলো, কীভাবে শিল্পীরা সমবেত হয়েছিলেন, সংগীত পরিবেশনার আদ্যোপান্ত তিনি বিশ্লেষণ করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকলেখকের সরাসরি সাক্ষাৎ হয়েছিল জর্জ হ্যারিসনের স্ত্রী অলিভিয়া হ্যারিসনের সঙ্গে। অলিভিয়া লেখককে বলেছিলেন, রবির মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে জর্জের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে রবির যন্ত্রণার সঙ্গী হয়ে কনসার্টের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিল জর্জ। সব সময় ওকে বলতে শুনেছি, বাংলাদেশের জন্য তার আরও কিছু করার ছিল। সেদিনের কনসার্টে প্রায় অর্ধলক্ষ দর্শক হাজির ছিল ম্যাডিসন স্কয়ারে। রবিশঙ্করের ধারণাতীত দর্শকের উপস্থিতি ছিল সেই কনসার্টে। একই দিনে দুটি অনুষ্ঠান করতে হয় উদ্যোক্তাদের। সেবার তহবিল সংগৃহীত হয়েছিল ২ লাখ ৪৩ হাজার ডলারের অধিক, যা রবিশঙ্করের ধারণার তিন গুণের অধিক। লেখক রবিশঙ্করের এক সাক্ষাৎকারের বরাতে জানান, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আমার যে অনুভূতি, তার পুরোটাই ব্যক্তিগত পর্যায়ের। এর কারণ, আমি নিজে একজন বাঙালি।

ম্যাডিসন স্কয়ারের দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ যত আলোচিত, ঠিক তত অনালোচিত থেকেছে ওভালে গুডবাই সামার কনসার্ট। একাত্তরের ১৮ সেপ্টেম্বর কনসার্টটি অনুষ্ঠিত হয়। সে রক কনসার্টের উদ্যোক্তা ছিল কস্তুর নামের দাতব্য সংগঠন। সত্তরের জনপ্রিয় রকদল দ্য হু, দ্য ফেসেস, মট দ্য হুপল, লিন্ডিসফার্ন, কুইনটেসেন্স, অ্যাটমিক রুস্টার, দ্য গ্রিস ব্যান্ড, ও কোচিস-এর গান পরিবেশন করে। সে কনসার্টে মার্কিন দেশ থেকে যুক্ত হয় ব্যান্ড দল আমেরিকা। লেখক বলছেন, বাংলাদেশকে নিয়ে বাঁধা তাঁদের সুর পৌঁছেছে বিশ্ববাসীর কাছে। দুর্ভাগ্যক্রমে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই বন্ধুদের অনেক কিছুই আমাদের কাছে পৌঁছায়নি, আমরা জানতে পারিনি। একই বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় কনসার্ট ইন সিমপ্যাথি ১৯৭১। সেটার উদ্যোক্তা ছিলেন রবিশঙ্করের ভাইপো বীরেন্দ্রশঙ্কর। সেই অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন অস্কারজয়ী প্রখ্যাত শিল্পী গ্লেন্ডা জ্যাকসন। আরেক বিশেষ কারণে কনসার্টটি গুরুত্ববহবাংলাদেশের দুজন লোকসংগীতশিল্পী মোহম্মদ মোশাদ আলী ও শাহ আলী সরকার সেখানে গান পরিবেশন করেন। লেখক বলছেন—‘কোনো ভিনদেশ থেকে দূরের এই ছোট্ট যুদ্ধপীড়িত দেশটির প্রতি যে মমতা প্রদর্শন করেছেন তা অতুলনীয়, চিরস্মরণযোগ্য।

ভালোবাসায় বাড়ানো হাত গ্রন্থের শেষ পর্বের শিরোনাম নিউ ইয়র্কে অ্যালেন গিন্সবার্গ ও আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কির কবিতাপাঠ। গিন্সবার্গের উদ্যোগে এই কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানে আরও ছিলেন কেনেথ কচ, এড স্যান্ডার্স, পিটার অলরোবভস্কি, গ্রেগরি কর্সো, ডিক গ্যালপ, মাইকেল ব্রাউনস্টেইন, অ্যান ওল্ডম্যান, রন প্যাজেট প্রমুখ। সেই অনুষ্ঠানের উপার্জিত অর্ধ বাংলাদেশের অসহায় শরণাথীদের তহবিলে দান করেন। একাত্তরে তিনি শরণার্থী শিবিরের দুঃখ-দুর্দশা দেখতে আসেন। লিখেন এক ঐতিহাসিক কবিতা সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড। মতিউর রহমান বলছেন—‘অ্যালেন গিন্সবার্গের এ কবিতার [সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড] কথা অনেকেই নানাভাবে জানলেও নিউ ইয়র্কে যে কবিতাপাঠ অনুষ্ঠান হয়েছিল, সম্ভবত সেটা তাঁর নিজের উদ্যোগেই, সেটির কথা আমরা অনেকেই জানি না। একথা সত্যগিন্সবার্গের অতুলনীয় কবিতাটি মৌসুমী ভৌমিকের কণ্ঠে গানের কারণে আমাদের এখানে আরও জনপ্রিয় হয়েছিল।

পরিশেষে একথা বলা যায়ভালোবাসায় বাড়ানো হাত বইটি একাত্তরের সাংস্কৃতিক যুদ্ধের এক অনন্য ইতিহাস। মতিউর রহমান বইটিতে জানা-অজানা দু-ধরনের ইতিহাস সন্নিবেশ করেছেন। বইয়ের বড় গুণ ঘটনাবহুল তথ্য-উপাত্ত, ভাষার আবেগ আর অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ। কেননা ভিনদেশি লেখক, শিল্পী, কবি, সমাজকর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা একাত্তরে মুক্তিকামী বাঙালির স্বাধীনতার পক্ষে যে নিঃশর্ত সমর্থন, মানবিক সহায়তা ও কূটনৈতিক আন্দোলন চালিয়েছেন, সেটা দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল ঘটনা। বাঙালির দিক থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হলো জাতীয়তাবাদী মুক্তির সংগ্রাম, কিন্তু সেই সংগ্রাম পৃথিবীর দেশে দেশে উপনিবেশ বিরোধী সাংস্কৃতিক যুদ্ধে পর্যবসিত হয়। বস্তুত অপর ভাষার লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের এই লড়াই ছিল উপনিবেশ ও সাংস্কৃতিক মুক্তির এক অধ্যায়, অনন্য এক যুদ্ধ। যেন শিল্পের সব পথ মিলে যায় এক মানবিক পথের দিশায়। বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধের ময়দানে যেমন লড়েছেন, তাঁরাও লড়েছেন অন্যভাবে, কবিতা লেখা, পাঠ, সংগীত আর শিল্প সৃষ্টি ও পরিবেশনার ভেতর দিয়ে। এককথায় বলা যায়, ভালোবাসায় বাড়ানো হাত বইটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসের নতুন সংযোজন। একই সঙ্গে বইয়ের তথ্য-উপাত্ত ভবিষ্যত ইতিহাস চর্চার পথকে আরও প্রশস্ত করবে।