বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের সংকট কোথায়?

 

হেনরি লুইস মর্গানের লেখা প্রাচীন সমাজ [এনশিয়েন্ট সোসাইটি] বইটির কথা আজকের দিনে পাঠকমাত্রেই জানেন। বইটির গুণমুগ্ধ ভক্ত ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি নামের কালজয়ী গ্রন্থটিও আসলে এই প্রথমোক্ত বইটিরই একটা গ্রন্থ-আলোচনা। কিন্তু আমরা এই দুই বই নিয়ে এখন আলোচনায় ঢুকব না, বরং হেনরি লুইস মর্গানের বইটার প্রকাশনা নিয়ে এঙ্গেলসের কিছু মন্তব্য আমাদের এখনকার আলোচ্য, কেননা সেটা থেকে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা সম্ভব, সম্ভব উত্তরণের পথ অনুসন্ধানও।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ১৮৮৮ সালে নিউ ইয়র্ক থেকে ফেরার পথে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের সাথে একজন মার্কিন কংগ্রেস সদস্যের সাক্ষাৎ হয়, যিনি লুইস মর্গানকে চিনতেন। দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি মর্গান সম্পর্কে এঙ্গেলসকে খুব বেশি কিছু বলতে পারেননি, যদিও জানিয়েছিলেন মর্গান সারা দিন তার পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তবে তার এক ভাই ছিলেন কর্নেল, যিনি ওয়াশিংটনে সমর দপ্তরে একজন বড় কর্তা ছিলেন। তাঁর মাধ্যমেই মর্গান তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ সরকারি খরচে প্রকাশ করাতে পেরেছিলেন। এমনকি এই কংগ্রেস সদস্যও তাঁর প্রভাব ব্যবহার করেছেন মর্গানের জন্য। বইটি বাজারে আনতে এসব উদ্যোগের দরকার হয়েছিল; কারণ, এই বইগুলোর কোনো চাহিদা তখনকার মার্কিন সমাজে ছিল না।

বাংলাদেশে বইয়ের দামও অত্যধিক বেশি। এমনকি আসলে বাংলাদেশে বইয়ের দাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরা হিসাব করি, ডলারে বিনিময় করলে কত টাকা হয় বইটার দাম, কিন্তু এটা অত্যন্ত ভুল একটা পদ্ধতি। বইয়ের দাম কম না বেশি, সেই হিসাবটা আসলে করতে হবে একটা বই কিনতে পাঠককে তার আয়ের কত ভাগ খরচ করতে হয়

বোঝাই যায়, ভাই প্রভাবশালী কর্নেল না হলে, কংগ্রেসম্যান পরিচিত না হলে মর্গানের দশা আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কা ছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কোনো মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়, জ্ঞানচর্চার চক্র বা জনগণের মাঝে পড়াশোনার তেমন অভ্যাস না থাকায় এঙ্গেলস যখন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লিখছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বইটার কোনো সংস্করণ ছিল না। মার্কিন সমাজে নৃবিজ্ঞান বা এই বিষয়ক গবেষণা নিয়ে একটাও বইয়ের কোনো বাজার ছিল না, অন্যদিকে ব্রিটিশ বিদ্বৎসমাজ মার্কিনদের কাছ থেকে নৃবিজ্ঞানের পাঠ নিতে একদমই আগ্রহী ছিল না। ফলে বইটি চাপাই পড়ে ছিল। ইংরেজিতে লেখা মার্কিন আদিবাসীদের নিয়ে মর্গানের গ্রন্থটির সাথে এঙ্গেলস পরিচিত হয়েছিলেন এর একটি জার্মান অনুবাদের সূত্রে!

প্রকাশনা শিল্প এবং জ্ঞানচর্চার পরিধি বিষয়ে বাংলাদেশের দশা হুবহু ওই সময়ের মার্কিন সমাজের মতো না হলেও একটা সাদৃশ্য মিলবে: গবেষণামূলক গ্রন্থের পাঠকের সংখ্যা বৃদ্ধির মতো উপযুক্ত ক্ষেত্র এখনো প্রস্তুত হয়নি। কিন্তু নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য বরং বহুগুণ বেশি জাঁকিয়ে আছে, অপ্রয়োজনীয় গ্রন্থের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাই এখানে প্রবল।

এই বিষয়টাতে গুরুত্ব দিয়েই আজকের আলোচনাটা আগাতে চাই: পাঠক শূন্য থেকে তৈরি হয় না, পাঠক তৈরিতে রাষ্ট্র ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে উদ্যোগ নিতে হয়। প্রকাশনা শিল্পের সংকটের বহু দিক নিয়ে বাজারে আলোচনা হয়, কেউ প্রকাশককে শূলবিদ্ধ করেন, কেউ পাঠকের রুচিকে প্রশ্ন করেন, কেউ উপযুক্ত গবেষক-লেখকের অনুপস্থিতি নিয়ে হাহাকার করেন, কারও আপত্তি বই বিক্রেতাকে নিয়ে, কেউ বাজারের অদৃশ্য হাতের ওপর সবটা দায় চাপিয়ে দেন। এই সব কটি যুক্তিরই কিছু সারবত্তা আছে, সত্যি। কিন্তু সম্ভবত সেগুলো সবই রোগের লক্ষণ, আলাদা করে তাদের প্রতিকার সম্ভব নয়। বলা যায় কতগুলো নির্দিষ্ট নেতিবাচক সংকট উপস্থিত থাকলে লেখক-পাঠক-প্রকাশক-বিক্রেতা যা যা আচরণ করতে পারতেন, প্রায় তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে।

কিন্তু লক্ষণগুলো ধরে ধরেই আলাপ করা যাক, তাতে হয়তো ব্যাধিটাকে চিনতে সুবিধা হবে।

 

বাংলাদেশে সৃজনশীল বইয়ের বাজার কত কোটি টাকার? বলাটা মুশকিল। কিন্তু আন্দাজ করা যায়। ২০২১ সালে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির তৎকালীন সভাপতি ফরিদ আহমেদ বিবিসির সাথে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, দেশের প্রকাশনা শিল্পের বাজার ১৫ হাজার কোটি থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে সৃজনশীল বইয়ের বাজার ৫০০ কোটি টাকার মতো।

এই সৃজনশীলতার সংজ্ঞা নিয়ে নানান প্রশ্ন আসতে পারে, তা-ও যদি তর্কের খাতিরে ধরে নিই এটা একটা মানদণ্ড, সেটিও প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে মাথাপিছু সৃজনশীল গ্রন্থের পাঠক কত? ২৭ টাকার কিছু বেশি! বিনোদন কিংবা জ্ঞানার্জন অথবা গবেষণা, এই মাথাপিছু ২৭ টাকাই আমাদের জাতীয় গ্রন্থাভ্যাসের সূচক।

পাঠককে দোষারোপ করবেন? দোষটা তাদের? আসুন, আমরা আরও ভেতরে যাবার চেষ্টা করি।

বাংলাদেশে বইয়ের দামও অত্যধিক বেশি। এমনকি আসলে বাংলাদেশে বইয়ের দাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরা হিসাব করি, ডলারে বিনিময় করলে কত টাকা হয় বইটার দাম, কিন্তু এটা অত্যন্ত ভুল একটা পদ্ধতি। বইয়ের দাম কম না বেশি, সেই হিসাবটা আসলে করতে হবে একটা বই কিনতে পাঠককে তার আয়ের কত ভাগ খরচ করতে হয়।

ধরুন, শিশুদের জনপ্রিয় প্রকাশনী ডিকে, তাদের কিছু বইয়ের দাম দেখলাম ১০ ডলার। জনপ্রিয় কিছু গবেষণামূলক বইয়ের দাম উল্টে দেখলাম, ২৫-৩০ ডলার, ১৫০ ডলারও আছে খুব কম বিক্রি হবে এমন কিছু গবেষণামূলক বই। জনপ্রিয় উপন্যাসের দাম মোটামুটি ২৫ ডলার। হানড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউড ২৮ ডলার শক্ত বাঁধাই, দশ ডলার পেপারব্যাক।

এই ২৮ ডলার ব্যয় করতে একজন ছাত্রের জন্য গড়ে দুই কর্মঘণ্টাই যথেষ্ট। শিশুসন্তানের জন্য ডাইনোসর নিয়ে একটা বই কিনতে একজন মার্কিন শ্রমিকের জন্য এক কর্মঘণ্টার আয়ই যথেষ্ট। বাংলাদেশে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর নাগালের বাইরে বাংলাদেশের মাঝারি থেকে ভালো বইপত্রের দাম। সন্তানের জন্য একটা ৩০০ টাকা দামের বই কিনতে একজন পোশাকশ্রমিককে ব্যয় করতে হবে গোটা এক দিন কিংবা তার চেয়ে বেশি সময়ের আয়। একজন রিকশাচালকের অর্ধেক দিনের আয়।

ফলে, গড় জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে বাংলাদেশে বইয়ের দাম অত্যন্ত বেশি। মার্কিন নিম্নতম আয়ের শ্রমিকের সাথে হিসাব করে হয়তো বলা যাবে সেটা ছয় থেকে আট গুণ বেশি।

 

বাংলাদেশে প্রকাশকেরা কেমন মুনাফা করেন? বাজারের দিকে যদি তাকান, কয়েকটা অদ্ভুত বাস্তবতা দেখতে পাবেন। এগুলো পর্যবেক্ষণজাত কথা, পরিসংখ্যান ছাড়াই বলছি।

ক. বাংলাদেশে পেশাদার প্রকাশকের সংখ্যা ১৮ কোটি মানুষের তুলনায় বেশ নগণ্য। পেশাদার বলতে বুঝিয়েছি যাঁরা প্রকাশক ছাড়া অন্য কোনো পেশার সাথে যুক্ত নন।

খ. প্রকাশকদের একটা বড় অংশ প্রকাশনার সাথে নানান কারণে জড়িয়ে গেছেন। প্রকাশনা থেকে তাঁরা চলবার মতো মুনাফা করেন না; বরং অন্য কাজ করে তাঁদের জীবনের ভর্তুকি জোগাতে হয়। এর মাঝে আছে ছাপাছাপি, সাংবাদিকতা, সরবরাহ ব্যবসা ইত্যাদি।

গ. পেশাদার প্রকাশকদের বড় অংশ গ্রন্থ সম্পাদনা বা এমন কোনো কাজে সামান্যই যুক্ত, বরং তাঁদেরকে ব্যস্ত থাকতে হয় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বড় আমলা, ব্যবসায়ী এবং নানান প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য।

ঘ. ব্যক্তিগত যোগাযোগের কল্যাণে সফল নন এমন সংখ্যাল্প প্রকাশক হয় অতিরিক্ত পরিশ্রমী, অসম্ভব বাজার-কৌশলী অথবা কিছু ব্যবসাসফল বাজার প্রবণতাকে করায়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। যেমন সম্প্রতি অনুপ্রেরণাদায়ী গ্রন্থাদির একটা বড় বাজার দেশে গড়ে উঠেছে।

ঙ. জনপ্রিয় উপন্যাস বাদ দিয়ে শুধু গবেষণানির্ভর গ্রন্থ প্রকাশ করে এবং পাঠক ও ক্রেতার ওপর নির্ভর করে নতুন যে গোটা কয়েক প্রকাশনা সংস্থা গড়ে উঠেছে, তাদের বড় অংশই বেশ প্রতিকূল পরিস্থিতিই পাড়ি দিচ্ছে।

চ. বইয়ের যাঁরা বিক্রেতা, তাঁদের নিয়েও আলাপ করাটা জরুরি, তাঁরাই ক্রেতার হাতে বইটা পৌঁছে দেন। বাংলাদেশের প্রধান বইয়ের দোকানগুলো আসলে ৯০ দশকের শেষে উঠেই গেছে। নিউমার্কেটের এবং আজিজ সুপার মার্কেটের হাতে গোনা কয়েকটা বইয়ের দোকান টিকে আছে। রেলওয়ে স্টেশনের বইয়ের দোকানগুলো টিকে নাই। জেলা শহরের বইয়ের দোকানও অনেক ক্ষেত্রে গাইডবইয়ের দোকানে পরিণত হয়েছে, কিংবা উঠে গেছে। অল্প কয়েকটা পুরোনো জেলা শহরে একটা বা দুটো ভালো বইয়ের দোকান আছে।

এই দোকানগুলো উঠে গেছে, তার প্রধান কারণ, বই বিক্রি করে তাদের পোষাচ্ছিল না। ৯০ দশক পর্যন্ত যে আয়ে সংসার চলত, সেটা নিতান্তই অপর্যাপ্ত হয়ে যায়। ফলে এই দোকানগুলো টিকে থাকেনি, যদিও পাঠক কিংবা ক্রেতা ছিল।

এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। অনলাইনে বিপুল বিক্রি কিংবা বড় বড় কয়েকটি বইয়ের দোকানের আবির্ভাবের কারণে ছোট দোকানগুলো উঠে যায়নি; বরং খেয়াল করলে দেখা যাবে, অনলাইনে রকমারির আবির্ভাব, কিংবা বাতিঘরের আবির্ভাব যখন ঘটেছে, তার আগেই অধিকাংশ ছোট মাঝারি বইয়ের দোকান উঠে গেছে। ফলে এই বিচ্ছিন্ন পাঠকেরা, কিংবা নতুন প্রজন্মের পাঠকেরা অন্তর্জালনির্ভর বইয়ের ক্রেতা হয়েছেন, অথবা বড় বইয়ের দোকানগুলোতে ভিড় জমিয়েছেন। পাঠকের এই সংখ্যা অজস্র ছোট দোকানকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম নয়, কিন্তু একত্রভাবে তারা কয়েকটা পুস্তক বিক্রেতার জন্য যথেষ্ট আকর্ষণীয়।

কিন্তু আপনাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, বইয়ের বাজারের বেলায় এই দেশে বড় পুঁজির দোকানদার এসে ছোট পুঁজিকে গিলে খায়নি, বরং বড় পুঁজির আবির্ভাব ঘটেছে ছোট ছোট পুস্তক বিক্রেতার বিলুপ্তির পর।

কেন এবং কোন বাস্তবতায় পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের চেয়ে বেশি হারে বাংলাদেশে বইয়ের দোকান উধাও হয়েছিল, এবং অনলাইন ও বড় দোকানের পরবর্তীকালীন আবির্ভাব সেই বাস্তবতার চাকাকে কতখানি ঘুচিয়েছে, এবং সেটা কতখানি ইতিবাচক, বা নেতিবাচক, তা ভাববার বিষয়।

 

বড় বইয়ের দোকানের আবির্ভাবের একটা বড় সুবিধা আছে, পাঠক একসাথে অজস্র বই পান। অন্যদিকে একটা অসুবিধাও আছে, বড় দোকানদার আপনার রুচিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আপনার সামনে থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ বইকে অদৃশ্য করে দিতে পারে, আবার বহু অগুরুত্বপূর্ণ বইকে ভীষণ জরুরি করে তুলতে পারে। এই সত্য অন্তর্জাল এবং দোকানদুই বেলাতেই হতে পারে। বাংলাদেশে সেটা ঘটছে।

বই বিষয়ে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরা প্রায়ই বলেন, অনলাইনের যুগে দোকানের গুরুত্ব কি আর আছে আগের মতো?

অত্যন্ত ভুল একটা ধারণা। একটা ছোট উদাহরণ দেওয়া যাক। আজিজ সুপার মার্কেটের ছোট ছোট বইয়ের দোকানগুলো কেবল স্রেফ বইয়ের দোকান ছিল না। ছিল অজস্র আড্ডা আর পাঠচক্রের কেন্দ্রও। দুনিয়ার প্রায় সকল দেশেই বহু ছোট মাঝারি দোকান এমন চর্চার কেন্দ্র। আগেও ছিল, অন্তর্জালের যুগেও আছে।

অনলাইনে লোকে বই কেনে পছন্দ হবার পর। পছন্দটা তৈরি করতে কিছুটা ভূমিকা রাখে লিখিত সাহিত্য আলোচনা। বড় অংশের ভূমিকা রাখে আসলে জীবন্ত যোগাযোগ। পৃথিবীজুড়েই এই যোগাযোগের একটা বড় অংশ হয় শ্রেণিকক্ষে ও শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষার্থীর মাঝে। যেভাবেই হোক, এই যোগাযোগটা বাংলাদেশে অত্যন্ত কম। বই না পড়েই [বই না কিনে তো বটেই] এ দেশে সর্বোচ্চ সনদও মেলে।

বইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলায় জীবন্ত যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বিদ্যায়তন, যেখানে কিছু ব্যতিক্রমী উদাহরণ ছাড়া প্রায় অচল, সে দেশে বইয়ের দোকানগুলো ছিল এমন যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সোপান।

এই দোকানগুলো উঠে যাওয়ায় সেগুলোকে কেন্দ্র করে যে আড্ডা, পাঠচক্র, লেখক-পাঠক, পাঠক-পাঠক আলাপ ইত্যাদি ছিল, তা-ও একরকম বিলুপ্ত হয়েছে।

অন্যদিকে এই দোকানগুলোর পরিচালনা পদ্ধতিতে একটা অনানুষ্ঠানিক, এবং বলা যায় ব্যক্তিগত যোগাযোগের প্রক্রিয়া ছিল। ভারতীয় বই অসংখ্য থাকলেও অধিকাংশ পাঠকপ্রিয় বাংলাদেশের বই তাঁরা রাখতেন। এঁদের বড় অংশেই মালিক কিংবা ব্যবস্থাপক নিজেও কর্মী হিসেবে কাজ করতেন, এবং তাঁরা সাধারণত বইয়ের সমঝদার ছিলেন। ফলে শুধু বইয়ের নাম ও লেখকের নাম জানা নয়, নতুন পাঠকদের সাথে তাঁরা বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়েও আলাপ করতে পারতেন।

ছোট দোকানগুলো উঠে যাবার অন্য একটা পরিণতি হলো একক বৃহৎ দোকানদারের রুচির ওপর পাঠক যেমন নির্ভরশীল হচ্ছেন, প্রকাশকও। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনভাবে বিক্রেতা যা হাজির করছেন, পাঠক তাই দেখছেন এবং সেইটুকুকেই বইয়ের জগৎ বলে ভাবছেন। আগেও বাংলাদেশে ভারতীয় বইয়ের আধিপত্য ছিল, কিন্তু এখন এই একচেটিয়া বিপণনের সূত্র ধরে তা অমিত তেজে আবির্ভূত হয়েছে।

আমি ভারতীয় বা পাকিস্তানি কিংবা মার্কিনকোন বইয়েরই বিরোধী নই। জ্ঞানের লেনদেনের জায়গাটা উন্মুক্ত থাকাটা দরকার। কিন্তু কেমন হয়, যদি বাংলাদেশে প্রকাশিত বইপত্র বিক্রি করাটা বিক্রেতার জন্য অলাভজনক আর বিদেশি বই বিক্রি করাটা অত্যন্ত লাভজনক হয়?

ছোট/মাঝারি বইয়ের দোকানগুলো উঠে যাওয়ায় এই ক্ষতিটা হয়েছে মর্মান্তিক। বই পছন্দ করার বেলায় বহুরুচি ও বহুস্বরের একটা উপস্থিতি ছিল, যেটা সাধারণ পাঠক এবং বিশেষ করে উঠতি পাঠকের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। ভাবা যায়, ৯০ দশকে আজিজ সুপার মার্কেটে মমতাজুর রহমান তরফদারের হোসেন শাহী বেঙ্গল বইটা নিয়ে একটা আলাপ শুনে বইটার অনুবাদ কিনতে বাধ্য হয়েছিলাম। এমন অজস্র বইয়ের কথা বলতে পারি। এখন বাংলাদেশের কোনো বইয়ের দোকানে এই বই কিনতে পাওয়া যাবে না। পাঠক, আপনি নিজেও পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। এই অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে আনুষঙ্গিক তর্ক ও লেনদেনের আবহ তৈরি করার কথা ছিল, তার ঘাটতি সামান্য পরিমাণে হলেও আজিজ সুপার মার্কেট ও মফস্বলের বইয়ের দোকানগুলো পূরণ করত।

রক্তমাংসের এই লেনদেনের ঘাটতি অন্তর্জাল কিংবা বড় দোকান পূরণ করতে সক্ষম নয়। বহুস্বর ও বহুমতের উপস্থিতিও সে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের মতাদর্শ কিংবা বাণিজ্যিক স্বার্থ পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

 

ছোট দোকানগুলো উঠে যাবার অন্য একটা পরিণতি হলো একক বৃহৎ দোকানদারের রুচির ওপর পাঠক যেমন নির্ভরশীল হচ্ছেন, প্রকাশকও। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনভাবে বিক্রেতা যা হাজির করছেন, পাঠক তাই দেখছেন এবং সেইটুকুকেই বইয়ের জগৎ বলে ভাবছেন। আগেও বাংলাদেশে ভারতীয় বইয়ের আধিপত্য ছিল, কিন্তু এখন এই একচেটিয়া বিপণনের সূত্র ধরে তা অমিত তেজে আবির্ভূত হয়েছে।

আমি ভারতীয় বা পাকিস্তানি কিংবা মার্কিনকোন বইয়েরই বিরোধী নই। জ্ঞানের লেনদেনের জায়গাটা উন্মুক্তিই থাকাটা দরকার। কিন্তু কেমন হয়, যদি বাংলাদেশে প্রকাশিত বইপত্র বিক্রি করাটা বিক্রেতার জন্য অলাভজনক আর বিদেশি বই বিক্রি করাটা অত্যন্ত লাভজনক হয়?

সমস্যার এই দিকটা পরিষ্কার করে বলি: একদিকে বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্প নানান অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে রীতিমতো যুদ্ধ করে টিকে থাকছে, তার ওপর তাদের বইপত্র দেশের বইয়ের দোকানগুলো রাখছে খুব কম সংখ্যায়, এবং বহুক্ষেত্রে মানহীন বিদেশি বইপত্রও বড় বড় দোকানে স্তূপীকৃত হয়ে থাকছে।

আমি বিব্রত হয়ে শুনেছি, আমাদের প্রজন্মের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কথাসাহিত্যিকের জন্মদিনের আয়োজনে দোকানটিতে তাঁর কোনো বই ছিল না। আমাদের আগের প্রজন্মের একজন অর্থনীতিবিদের একটা আয়োজনের দিন তাঁর বই কিনতে ব্যর্থ হয়েছেন বন্ধুরা। বলা যায়, নমুনা হিসেবে একজন-দুজন করে রাখা হয় দেশীয় গবেষণাগ্রন্থ-উপন্যাস-কবিতা এবং অন্য কিছু।

কোনো বইয়ের দোকানি বলবেন না যে বদরুদ্দীন উমরের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও তৎকালীন বাঙালী সমাজ কিংবা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলার কৃষক বইটার চাহিদা কমে গেছে, রাখলে বিক্রি হবে না। কিন্তু দোকানে পাবেন না। এই সব বইপত্র মূলত অনলাইনেই বিক্রি হয়, মানে যাঁরা জানেন, কিংবা নানান কারণে শুনেছেন, তাঁরা অনলাইনে জোগাড় করেন। কিন্তু বইয়ের দোকানের অন্যতম যে কাজপ্রদর্শন এবং প্রদর্শনের সূত্রে পাঠকের সামনে হাজির হওয়া, সেটা নিয়ে বন্ধুদের আলাপ এবং বিক্রিসেটা বন্ধ হয়েছে।

লেখকের বই যখন প্রদর্শিত হয়, লেখক তখন উদযাপিত হন। ওই অর্থে প্রতিটা বইয়ের তাক, বইয়ের মলাটের দিকে আঙুলি নির্দেশ, বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে ঝগড়া কিংবা আলাপ, প্রচ্ছদ নিয়ে তারিফসবই অজস্র আয়োজনে লেখকের সামাজিক প্রতিষ্ঠা, তার সাথে প্রকাশক, প্রচ্ছদশিল্পী, সম্পাদক এঁরাও সম্মানিত হন।

দেশের উল্লেখযোগ্য গবেষণাগ্রন্থগুলো, উল্লেখযোগ্য কবিতা বা গল্প উপন্যাসগুলো যখন বইয়ের দোকানের তাকে অনুপস্থিত থাকে, সেই অভাব যদি আপনি আমদানি করা বই দিয়ে মেটানও, সমাজে লেখকের যে প্রতিষ্ঠা, যে মর্যাদা, যে পরিচিতি, যে আলোচনা ও দৃষ্টি আকর্ষণ পাবার কথা, সেটাকে সাধারণভাবে গৌণ করে দেয়। আমদানি করা প্রগতিশীলতা সর্বদাই বিপজ্জনক, তা কেবল বিদেশি উৎপাদক আর দেশীয় ভোক্তার ছোট সীমাতেই আটকে থাকে, আর চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতায় প্লাবিত থাকে। সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে সাহিত্য বলি, চিন্তা বলি, গবেষণা বলি, সেটা নিজের সমাজেই হতে হবে, তার পুষ্টি জোগাতে হবে বৃহত্তর সমাজ থেকে। সেই কাজটা একদম বন্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশের গ্রন্থ বিপণন শিল্পে। একদম মানে একদমই। বিক্রেতা যখন প্রকাশক, তখন তিনি যে যে বিশেষ লেখকের বই প্রকাশ করেছেন, কিংবা যাঁদের যাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে চান নানান আনুকূল্যের লোভে, তাঁদের বাইরে সকল দেশীয় লেখকের জন্য এই সত্য প্রযোজ্য। লাখো বইয়ের দোকানেও বিশ শতাংশও দেশি বই না থাকা কিংবা প্রধান লেখকদের বইয়ের অনুপস্থিত থাকাটা লেখকদেরকে তাঁদের ন্যায্য মাঠ থেকে বঞ্চিত করেছে। একই সাথে এটা দেশীয় প্রকাশনা শিল্পের জন্য একটা বিরাট বস্তুগত হুমকিও।