পিতা, কী সুন্দর ভাত ও গিরস্তি

 

দ্বিতীয় ছেলের বয়স যখন দুই কি আড়াই বছর, তখন আকুন্দদের বাসায় একজন গৃহকর্মীর খুব প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কারণ, আকুন্দের বউ তখন সংসারের আয়-উন্নতির কথা চিন্তা করে একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিল, তাই ছোটা কাজের লোক দিয়ে আর সামাল দেওয়া যাচ্ছিল না। তারা অবশ্য চটজলদি একটা মেয়ে পেয়েও যায় আকুন্দের ছোট বোনের মাধ্যমে। একদিন ১০-১১ বছরের মেয়েটাকে নিয়ে তার বাবা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর থেকে ঢাকা এসে হাজির হলো। আকুন্দদের বাসায় খাওয়াদাওয়া করে মেয়েটাকে রেখে যাবার সময় বাসার নিচে আকুন্দের দুটি হাত ধরে লোকটা বলল: ভাই, আমার মেয়েটাকে নিজের মেয়ে মনে করবেন! মনে করবেন, আপনি তার পিতা!

ইঙ্গিতটা ছিল স্পষ্ট। আকুন্দের অবশ্য তাতে রাগ হলো না। সে বুঝতে পারছিল লোকটা নিরুপায়। মেয়েটাকে সে অজানা-অচেনা মানুষের মধ্যে রেখে যাচ্ছে। মেয়েটা গৃহকাজ করে যে কয়েক হাজার টাকা পাবে, তাতে লোকটার সংসার কিছুটা হলেও চলবে। তার আরও কয়েকটা ছোট ছেলে-মেয়ে আছে। তার বড় একটা মেয়েও আছে, যার বিয়ের কথাবার্তা চলছে। কিন্তু পরিস্থিতি যত শোচনীয়ই হোক, লোকটা যেহেতু মেয়েটার বাবা, তাই এই পরিস্থিতিতেও তার দরকার ছিল আকুন্দের কাছ থেকে এমন কোনো নিশ্চয়তা, যাতে সে স্বস্তিতে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। আকুন্দ লোকটার খসখসে কড়া-পড়া হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে এনে কর্কশ স্বরে বলল, কোনো চিন্তা করবেন না! আকুন্দের মনে হলো, কর্কশ স্বরে বলার কারণেই কিনা কে জানে, লোকটা তার কথা বিশ্বাস করল। আকুন্দের মুখের দিকে একবার তাকাল, তারপর আর কিছু না বলে চলে গেল।

তারপর আকুন্দদের পরিবারে যথারীতি সব চলতে লাগল। সকালে তার বউ বড় ছেলেকে, যে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে, স্কুলে দিয়ে নিজের দোকানে চলে যায়, মেয়েদের পোশাক বিক্রি করে। ছোট ছেলেটা ও গৃহকর্মী মেয়েটা বাসায় থাকে। আকুন্দও বাসায় থাকে। দৈনিক পত্রিকার ডেস্কে কাজ করার সুবাদে আকুন্দ দুপুরে অফিসে যায়। দুপুর পর্যন্ত বাসায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকা পড়ে, বই পড়ে, টিভিতে খেলা থাকলে খেলা দেখে। মেয়েটা ছোট ছেলেটাকে দেখে। ছেলেটার সাথে খেলা করে, গোসল করায়, খাওয়ায়। রান্না অবশ্য আকুন্দের বউই ভোরে করে রেখে যায়। মাঝে কিছু সময়ের জন্য আকুন্দ ছোট ছেলেটাকে দেখে। সেই ফাঁকে মেয়েটা অন্যান্য কাজ করেঘর ঝাড়ু দেয়, বিছানা গোছায়, বড় ও ছোট ছেলের খেলনা গোছায়। তবে সে কাজ করে ছায়ার মতো, নিঃশব্দে; আকুন্দের তেমন একটা নজরে আসে না। তারপর বউ বড় ছেলেকে নিয়ে দুপুরে বাসায় ফিরলে আকুন্দ রেডি হয়ে অফিসের দিকে রওনা দেয়। প্রতি মাস শেষে আকুন্দের বউ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে মেয়েটার মায়ের কাছে টাকা পাঠিয়ে দেয়।

এই একই রুটিন দিনের পর দিন চলতে থাকে। তবে আকুন্দের ছোট ছেলের মুখে নতুন নতুন কথা ফুটতে থাকে। যেমন: ট্যাকা, পতেকা ইত্যাদি। তাই আকুন্দকে ও তার বউকে তাদের ছোট ছেলে আর গৃহকর্মীর কথা চালাচালিতে হস্তক্ষেপ করতে হয়। কথা বলার সময় ঠিক করে দিতে হয়: ট্যাকা না টাকা, পতেকা না পতাকা। মেয়েটা শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণ করছে কি না, এই বিষয়টা খেয়াল রাখতে গিয়ে আকুন্দ একদিন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটা কথা শোনে। তখন মেয়েটা ছোট ছেলেকে ভাত খাওয়াচ্ছিল। সে শুনতে পেল মেয়েটা বলছে: কী সুন্দর ভাত! এই কথাটা সে সঠিক উচ্চারণেই বলেছিল। তবু মেয়েটা কেন এই কথাটা বলেছে, তা বুঝতে আকুন্দ নিজের ঘর থেকে বের হয়ে এলো। সে দেখল, তার ছোট ছেলে ভাত খেতে চাচ্ছে না, এদিকে হাতে মাখা-ভাত নিয়ে মেয়েটা বসে আছে। আকুন্দ বুঝতে পারল যে ভাতের দিকে তাকিয়েই মেয়েটা কথাটা বলেছে। নিজের ঘরে গিয়ে আকুন্দ স্মৃতি হাতড়াতে লাগল বের করতে যে তার জীবনে কখনো ভাতকে সুন্দর মনে হয়েছে কি না।

আরেক দিন মেয়েটা ছোট ছেলেটাকে ঘুম পাড়াতে নিয়ে গেলে ছেলেটা তার কাছ থেকে গল্প শুনতে চাইল। মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে কী জানি ভাবল। তারপর বলতে শুরু করল: এ্যাক দ্যাশে আছিল এ্যাক লোক। হে আছিল ভাদাইম্যা। কী করব কী করব করতে করতে শুরু করল গিরস্তি (কৃষিকাজ)। কিন্তুক একদিন বানে তার সব ফসল শ্যাষ হয়া গেল গা! খেইল খতম, গল্প শ্যাষ।

এই সব প্রাত্যহিক ব্যাপার-স্যাপারের মধ্যে আকুন্দ একদিন খেয়াল করে তার বাসার প্রতিটা ঘরের দেয়াল ভরে উঠেছে বিচিত্র সব চিত্রকর্মে। এমনকি যে ঘরটাতে বসে সে বইপত্র, পেপার-ম্যাগাজিন পড়ে ও কম্পিউটারে টুকটাক লেখালেখি করে, সেই ঘরটার দেয়াল পর্যন্ত চিত্রকর্মের হাত থেকে রেহাই পায়নি। আকুন্দ তার বউয়ের কাছে জানতে চায় দেয়ালে এত আঁকাআঁকি কে করেছে। কে আবার! তোমার দুই ছেলে আর তাজিন। তার বউ জবাব দেয়। আকুন্দ দেয়াল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। বিভিন্ন আকার ও ডিজাইনের গাড়ি, অ্যারোপ্লেন, জাতীয় পতাকার ফাঁকে ফাঁকে ফুল, লতাপাতা আঁকা হয়েছে। আকুন্দ তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারে ফুল, লতাপাতাগুলো তাজিন অর্থাৎ গৃহকর্মী এঁকেছে। তাই সে সেগুলো আরও ভালো করে দেখতে লাগল। সে দেখল ফুল ও লতাপাতাগুলো একই রকমের। আসলে লতাপাতাসমেত ঢোলকলমি ফুলকে বারবার এঁকেছে তাজিন। তবে এক জায়গায় একটা মানুষের মুখ আঁকা। অস্পষ্ট তবু বোঝা যায় মাঝবয়সী কোনো পুরুষের মুখ হবে। কার ছবি এঁকেছিস? আকুন্দ জানতে চাইলে তাজিন ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল: আব্বা।