শাহিদ আনোয়ারের সশস্ত্র পঙক্তিমালা!

 

বদ্বীপবাসীর অভিজ্ঞতা নতুন নয়। ঠিক আবার একদিন সমগ্র ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল অকস্মাৎ ঢেকে যায় জলপাই রঙের অন্ধকারে। পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী দশক আশি, শতক বিশ। ক্রমশ গর্জে ওঠে দেশ, সাথে বিপ্লবতীর্থ চট্টলা। স্বৈরাচারের বন্দুকের মৃত্যুতে সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোজাম্মেল।

সিন্দুকে বসে বন্দুক তোলে
নিন্দুক জেনারেল
বুকের মধ্যে গন্ধক পোষে 
লক্ষ মোজাম্মেল।
 [ক্রান্তিকাল]
 

সিন্ধুক লুণ্ঠনকারী নিন্দুক জেনারেলের বন্দুকের বিরুদ্ধে আমরা কবিতায় পেয়ে যাই শাহিদ আনোয়ারকে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লুণ্ঠন, দেশের কাঁধে চেপে বসা জলপাই দৈত্যের বিরুদ্ধে শুরু হয় কবিতার সংগ্রাম, জনতার সংগ্রাম। আপাদমস্তক কবি শাহিদ আনোয়ার একের পর এক লিখে চলেন সশস্ত্র পঙ্ক্তিমালা। মুক্তিযোদ্ধা, যাঁদেরকে শ্রেষ্ঠ সন্তান ভাবা হয়। তাঁদের একাংশ, নেতা থেকে অভিনেতা, সম্পাদক থেকে সচিব, কবি থেকে কর্নেল, বণিক থেকে বুদ্ধিজীবীতাঁদের অনেকেই জলপাই রঙে হাত রাঙাতে থাকেন। অনাপোস তরুণেরাই জোট বাঁধে, রাজপথে নামে, প্রাণ দেয় ও প্রাণিত করে। শাহিদ আনোয়ার সেই অনাপোস তারুণ্যের শুদ্ধতম প্রতিনিধি। মেধাবী শিক্ষার্থী শাহিদ পদ/পদবির মোহকে তাচ্ছিল্য করেন। বন্ধুদের কেউ কেউ সুশীল সেবক হয়ে প্রবেশ করেন নিরাপদ জীবনের সোনালি খাঁচায়। নীতিগত কারণে সোনালি খাঁচাকে প্রত্যাখ্যান করেন শাহিদ। বিপরীতে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ মুক্ত আকাশের প্রতি তাঁর পক্ষপাত কবিতার উর্বরভূমি প্রস্তুত করে। সামরিক স্বৈরাচারের ক্ষমতা দখলকে চিত্রিত করেন শাহিদ এভাবে।

উনি আমাদের বোঝাচ্ছেন তার আসিবার অপরিহার্যতা
যেন নবী, উনি ত্রাণকর্তা, এসে বসিবার প্রয়োজন
এবার উনার হাতে কোরিয়ান যাদুদণ্ড জাকার্তার তাস
মাথায় তুর্কী টুপি, বুকে পিঠে আরবী আতর
আগণ্ড বিস্তারে রেগানীয় মাঙ্গলিক হাসি। 
[উনি আমাদের বোঝাচ্ছেন: দ্রৌপদীর প্রেমিকেরা]
 

সমকালীন পাকিস্তানি ভূখণ্ডে সমর শাসক জিয়াউল হকের ক্ষমতা দখলকে বৈধতা দিতে আদালতের রায়টিও সচেতন পাঠকের স্মরণ হবে। খাদ্য দুষ্প্রাপ্যকালে অস্তিত্ব রক্ষার্থে মুসলমানের পক্ষে শূকরের মাংসের বৈধতা পবিত্র কোরআনে রয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত কোরআনের এই ব্যাখ্যাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সামরিক আইনকে অনিবার্য ঘোষণা করে [বেনজির ভুট্টো, ডটার অব দ্য ইস্ট, ২০০৮]। বঙ্গীয় স্বৈরাচার এক কাঠি সরেস। তিনি কেবল ধর্মকে নয়, কবিতাকেও দূষণের চেষ্টা করেন। শাহিদের বিবরণধর্মী কবিতাটিতে শিশুপুস্তক থেকে ছাউনির খানার টেবিলে ভর্তুকি বেশি দেওয়ার, কলকারখানা, জোতজমি, ঘাটের ইজারা দরদালান থেকে শুরু করে সুন্দরীদের ওপর ধনিকগোষ্ঠীর মোড়লিপনা বেশি প্রয়োজনের রাষ্ট্রীয় নিদের্শাবলির কথা বলা হয়। শ্রেণিস্বার্থের দিকটি স্পষ্ট হয় শেষ দুই পঙ্ক্তিতে।

আপন শ্রেণির নালিতে তুই গরম গাভির দুধ বারে বারে ঢেলে দিস বেটা
দূর হ, ছাউনী কুত্তা; তৃতীয় বিশ্বের বেশ্যা, মানুষ বুঝাইন্যা কেউকেটা।
 

উনি আমাদের বোঝাচ্ছেন কবিতাটি ১৯৮২ সনের সমর শাসকের উদ্দেশে লেখা হলেও পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের স্বৈরশাসনের বর্বরচিত্র ফুটে ওঠে। স্বৈরাচার-অধিকৃত কালই আরেক কবি নির্মলেন্দু গুণের কলমে লিখিয়ে নেয়, দূর হ দুঃশাসন নামক পঙ্ক্তিমালা। দ্রোহ-চেতনাই শাহিদ আনোয়ারের কাব্যচেতনার মূল সুর। সে দ্রোহ স্বৈরাচার ও ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে, পরাক্রমশালী দৈবের বিরুদ্ধে। তিনি ওড়াতে চান আকাশের দিকে লাল মাফলার। অভিনন্দন জানান লেনিনিস্ট সূর্যকে। ইতিহাসের পাকিস্তান পর্বে আইয়ুব-ইয়াহিয়া বাংলাদেশ পর্বে জিয়া-এরশাদের শাসন-শোষণ কবিতায় উৎকীর্ণ হয়ে আছে উজ্জ্বল অক্ষরে। সংবিধান কাটাছেঁড়া, ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্বিচারে হত্যার শাসন গণমানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। নিহতদের স্বজনেরা মৃতদেহের সন্ধান পর্যন্ত পায়নি। সন্ধান পাওয়া গেলে সৎকার হতো ক্ষমতাসীনদের বিশেষ নিয়ন্ত্রণে। আশির দশকে শুরুতে এক রাতে খুলনা জেলে সংঘটিত হয়েছিল বর্বর হত্যাকাণ্ড। এমন মর্মন্তুদ মৃত্যু নিয়ে শাহিদ লিখেন,

আমার বাপের শরীরখানা
চায় যে গাঁয়ের ঘাস-বিছানা
আকাশ তলে নীল ঠিকানা
দে-ফিরিয়ে লাশ।
সৈন্য ঘেরা গোরস্থানে
অমন থাকার হয় কি মানে
এই শরতে বাপ ওখানে
কাটায় পরবাস।... 
এই তো শহর ঘিঞ্জিঘেরা
রাজার বিচার কলজে ছেঁড়া
বন্ধ আঁখি বন্ধ জেরা—
দে ফিরিয়ে লাশ।
[খুলনা জেল-৮০: কুঁকড়ে আছি মনোটোনাস গর্ভে]
 

যদি কোন সমান দুঃখিত শক্তি কবিতাটি বাঙালির রাজনৈতিক উত্থানপর্ব বাহান্নের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রতীকে লেখা। ফেব্রুয়ারি নিছক বর্ষপঞ্জির যেকোনো মাস নয়। বাঙালির কাছে উত্থানের-উজ্জীবনের উজ্জ্বল বার্তাবহ। বাঙালি শোককে শক্তিতে রূপান্তরে, শক্তিকে দুঃস্বপ্ন ভাঙার প্রেরণা পায় ফেব্রুয়ারি থেকে। কবিতাটিতে গণমুখী শাসনব্যবস্থা আর কোটি কোটি মানুষের জিম্মিদশা থেকে মুক্তির চিরায়ত আকাঙ্ক্ষা প্রতিধ্বনিত হয়। উত্তর-স্বাধীনপর্বে দু-দুজন সামরিক প্রভুর বুটের তলায় পিষ্ট হয়েছে বাংলাদেশ। যেসব কবি স্বার্থ ও শর্তের ঊর্ধ্বে উঠে গণবিধ্বংসী সামরিক কালপর্বটি চিহ্নিত করেছেন কবিতায়। শাহিদ আনোয়ার নিঃসন্দেহে তাঁদের অন্যতম। ধনতান্ত্রিক সমাজ-রাষ্ট্রে মানুষের সীমাবদ্ধ জীবনে মুক্তির স্থান অনেক ঊর্ধ্বে। মানুষের সংগ্রামশীলতার পেছনে রয়েছে মুক্তির অদম্য বাসনা স্বাধীনতা পেলে আমি পরাধীন হতে ভালোবাসি [নির্মলেন্দু গুণ] পরাধীন হওয়ার শর্তেও মানুষ মুক্তিকে বাঞ্ছা করে। মুক্তির আকাঙ্ক্ষা মানুষ কেন, প্রতিটি প্রাণীরই শাশ্বত অনুভূতি। অন্য প্রাণীর সাথে পার্থক্য হচ্ছে অন্য প্রাণী যেখানে অসমর্থ, মানুষ মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে সেখানে প্রকাশে বাঙ্ময় করে তুলতে পারে। শাহিদের ধাত্রী কবিতাটি মুক্তির চিরন্তন আকুলতায় বাঙ্ময়।

জড়িয়ে আছি গর্ভে ফুলে ফুলে
মনোটোনাস রাত্রি ওঠে দুলে
উৎস থেকে আমায় ফেলো খুলে
মিথ্যা থেকে আমায় লহো তুলে
স্বপ্ন ছিঁড়ে দোলনা কাছে আনো
ধাত্রী আমার দুহাত ধরে টানো।

[ধাত্রী: কুঁকড়ে আছি মনোটোনাস গর্ভে

একটি আধ্যাত্মিক কবিতা সংলাপে লেখা শাহিদ আনোয়ারের উল্লেখযোগ্য কবিতা। প্রান্তিক ও মধ্যবিত্তের শ্রেণিগত দৃষ্টিভঙ্গিজাত তারতম্য সংলাপের মধ্য দিয়ে সুস্পষ্ট হয়। কবিতার শরীরে নদীবর্তী দেশে নদীর করালগ্রাসের ভয়াবহ রূপটির আভাস মেলে। প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার সাথে শ্রেণিশোষণের মিলিত রূপটি মানুষকে ক্রমশ প্রান্তিক স্তরে ঠেলে দেয়। কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র উপদ্রুত উপকূল সন্দ্বীপের একজন প্রান্তজন। যিনি প্রকৃতির বৈরী আচরণ ও প্রচলিত শোষণশৈলীতে নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর। যার হারানোর কিছুই নেই। দৈবের বিরুদ্ধে এমন নিঃস্বতর মানুষের বিদ্রোহই কবিতার উপভোগ্য দিক।

: দেখো মিঞা, ভাঙনে ভাঙিছে ঘর, পরওয়ার দেগারের গোপন বিধান তোমার একা ভাঙে নাই, হাছা কি না? 
: হাছা স্যার, তবে কন মিসকীনরে আরো মিসকীন, বানাবার ইটা কোন কিসিম বিধান? ইটা কোন কিসিমের বেঈমানী, লাখো লাখো মানুষের ঘর ভাঙ্গি দেওয়া?/ আমি যদি আরেকটা আল্লা হইতাম,/ তার ভিডামাডি, ধানীক্ষেত ভাঙ্গি চুরমার কইরা ইনসাফের নাও ভিড়াইতাম। 
[একটি আধ্যাত্মিক কবিতা: দ্রৌপদীর প্রেমিকেরা]

পাঠকের মনে অনায়াসে উঁকি দেবে নজরুলের

আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে, এঁকে দিই পদচিহ্ন।
আমি স্রষ্টা-সূদন শোক-তাপ হানা 
খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন। 

শাহিদ আনোয়ার  @ ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম থেকে

একটি আধ্যাত্মিক কবিতা সংলাপে লেখা শাহিদ আনোয়ারের উল্লেখযোগ্য কবিতা। প্রান্তিক ও মধ্যবিত্তের শ্রেণিগত দৃষ্টিভঙ্গিজাত তারতম্য সংলাপের মধ্য দিয়ে সুস্পষ্ট হয়। কবিতার শরীরে নদীবর্তী দেশে নদীর করালগ্রাসের ভয়াবহ রূপটির আভাস মেলে। প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার সাথে শ্রেণিশোষণের মিলিত রূপটি মানুষকে ক্রমশ প্রান্তিক স্তরে ঠেলে দেয়। কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র উপদ্রুত উপকূল সন্দ্বীপের একজন প্রান্তজন। যিনি প্রকৃতির বৈরী আচরণ ও প্রচলিত শোষণশৈলীতে নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর। যার হারানোর কিছুই নেই।

কবিতাটির আখ্যান রচিত হয়েছে বঙ্গোপসাগরীয় দ্বীপ সন্দ্বীপকে ঘিরে। কবিতাটি যশোহরের উপভাষার পরিবর্তে সন্দ্বীপের উপভাষায় লেখাই স্বাভাবিক ছিল। একপক্ষীয় প্রেমানুভূতি ও সূক্ষ্ম বিরহের কবিতা প্রতিবেশীনীর জন্য এলিজি। কবিতাটিতে বিবরণের ক্লান্তি থাকলেও শেষ অবধি স্নিগ্ধ হাহাকার ছুঁয়ে যায়। শাহিদ আনোয়ারের প্রেমের কবিতার চিত্রকল্প, উপমায় দ্রোহীচেতনার স্ফুরণ ঘটে। ব্যষ্টির মধ্যেও সমষ্টিচিন্তনের আভাস অনুপস্থিত থাকে না।

তুমি নিশ্চয় অস্বীকার করবে না
ইয়াসির আরাফাতও হতে পারেন বিশ্বাসঘাতক
তবুও ফিলিস্তিন স্বাধীন হবেই
তুমি নিশ্চয়ই অস্বীকার করবে না
আমাদের সমস্ত জীবন যদি হয় বিশ্বাসঘাতক
তবু 
কয়েকটি অলৌকিক মুহূর্তে
আমরা দুজন খুব স্বাধীন হবোই।
[তুমি নিশ্চয়ই: কুঁকড়ে আছি মনোটোনাস গর্ভে]

আমি বখে যাওয়া ছেলে আমি ঢিল ছুঁড়ে মারি
মাছি ভন ভন ওই রোয়া ওঠা জেনারেল যদি নাড়ে ল্যাজ
সেলিনা আক্তার, তুমি প্রস্তুত রেখো দেখো ভুলো না আবার
প্রিয় নীল শাড়িটির নীল আঁচলের কাঁটা নীল কিছু ব্যান্ডেজ।
[আকাশের দিকে ওড়ে লাল মাফলার: কুঁকড়ে আছি মনোটোনাস গর্ভে]

মানব দেহের সঙ্গে উপাসনালয়ের উপমা বাংলা ভাষায় নতুন নয়। দেহ দেউল, দেহ মাজার,...। কিন্তু দয়িতার দেহসৌষ্ঠবের সঙ্গে এ-সেমিটিক উপাসনালয়ের উপমায় বাঙালি কবিদের কুণ্ঠা থাকলেও শাহিদ অকুণ্ঠ। কবিতা কণা কবিতাটিতে এমন অনুপুঙ্খ উপমায় তিনি স্বাচ্ছন্দ্য। যদিও ভিন্ন প্রসঙ্গে হাসান হাফিজুর রহমানের নারীত্বের মহার্ঘ্য মসজিদ অনেক আগেই ব্যবহৃত হয়েছে। সূক্ষ্ম কাব্যবোধ ও অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস না থাকলে এমন উপমা ব্যবহার করা যায় না। স্বরবৃত্ত ছন্দ ও অন্ত্যমিলে লেখা তপস্যা সুখপাঠ্য কবিতা। প্রসাদগুণে উজ্জ্বল কবিতাটি বারবার পড়বার প্ররোচনা জাগায়। শাহিদের প্রিয় ছন্দ স্বরবৃত্তে রচিত দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ শুঁড়িখানার নুড়ির মধ্যে। পড়তে পড়তে ঘোর লেগে যায়। প্রথমে ছন্দের দোলার জন্য কানে বাজে। পরমুহূর্তে দার্শনিকতার স্তরটি অতিক্রম করতে পারলে প্রাণে বাজে। বহুকৌণিক-বহুরৈখিক কারুকাজে দীপ্র কবিতাসিরিজটি। আকারে ক্ষুদ্র কিন্তু দর্শনে গভীর কবিতাগুলো। কখনো খৈয়াম কিংবা গালিব কখনো হাফিজ কিংবা রুমিকে মনে করিয়ে দিলেও শাহিদের বুনন স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। সুফিবাদের আনাল হক কিংবা অদ্বৈতবাদের অহং ব্রহ্ম-এর প্রগাঢ় সৌন্দর্যে শাহিদ লিখেন,

[...] খোদার বর্ণ ধারণ করে
তোমায় ডাকি রোজ
পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গেছে
পিঁপড়েরা দেয় ভোজ।’
[৩৬: শুঁড়িখানার নুড়ির মধ্যে]

সংঘাত মুখর বিশ্বাসের নিরসনকল্পে সমন্বয়বাদী বিশ্বাসের সেতু রচনায় তাঁর উচ্চারণ

[...] অর্ধাঙ্গ আমার প্রেমে
অর্ধাঙ্গ জিবে
অর্ধাঙ্গ আল্লাতে ও অর্ধাঙ্গ শিবে। 
[২৯; প্রাগুক্ত]

শুঁড়িখানার তুচ্ছ নুড়ির গোলাপ ফোটানোর উচ্ছ্বাসে কাব্যগ্রন্থটি উজ্জ্বল। জেসাসের প্রসঙ্গ সর্বশেষ কবিতাটিকে প্রাণময় করে তোলে।

শুঁড়িখানার নুড়ির মধ্যে
একটি গোলাপ ফোটে
প্রেমের বুকে ধাতব পেরেক
জিসাস হয়ে ওঠে।
আমায় দেখো জেসাস করে
প্রেমময়তার রুহ্/
তোমার চোখে রক্তপাতের বিষণ্ন খুশবু। 
[৪৪; প্রাগুক্ত] 

ছড়ার শরীরে কবিতার শৈলী নির্মাণে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সাতনরীর হার-এর পরবর্তী প্রচেষ্টা শাহিদ আনোয়ারের শুঁড়িখানার নুড়ির মধ্যে। ইহজাগতিক সৌন্দর্যে বিশ্বাসী শাহিদ আনোয়ার অসংকোচে জানিয়ে দেন তিনি স্বর্গকাতর নন তিনি পৃথিবীকাতর। স্বর্গে শৈশবে প্রত্যার্বতনের সুযোগ নেই। স্বর্গে শিশুর জন্ম নেই। পৃথিবীতে শিশুর হাত ধরে কবির পক্ষে শৈশবে ফেরা যায়। একটি কবিতায় [স্বর্গকাতর নই আমি: দাঁড়াও আমার ক্ষতি] শাহিদের এমন নির্মোহ চেতনার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটে। শাহিদের কবিতার গভীরতা উপলব্ধিতে, জীবন-জিজ্ঞাসায়, ব্যষ্টি ছাড়িয়ে সমষ্টির উত্তরণে। সাহসের সৌন্দর্যে শাহিদ কি অনেককে ছাড়িয়ে যান না? ছন্দকুশল শাহিদ স্বরবৃত্তে গভীর ব্যঞ্জনা প্রকাশে উৎসাহী। তাঁর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কবিতা স্বরবৃত্তে রচিত হলেও অক্ষরবৃত্তেও তিনি স্বচ্ছন্দ। বৈদেহী এক ওষ্ঠ পোড়ে গ্রন্থে তাঁর অক্ষরবৃত্তের স্বাচ্ছন্দ্য স্পষ্ট। অন্ত্যমিলের প্রতি শাহিদের পক্ষপাত প্রকাশ্য। উজ্জ্বল অন্ত্যমিল ও ছন্দকুশলতায় তাঁর অবস্থান চোখে পড়ার মতো। কোলকাতা/ঢাকার নগরকেন্দ্রের বাসিন্দা নন তিনি। নন তথ্য মাধ্যমের আশীর্বাদ-প্রাপ্তদের একজন। সংগত কারণে নিভৃতচারী শাহিদ আনোয়ার কারও কাছে ঈষৎ অচেনা ঠেকতে পারেন। তবে প্রকাশের সারল্য ও বোধের ব্যাপ্তিতে তাঁর কবিতা বিলম্বে হলেও বাংলা কবিতার পাঠককে আকৃষ্ট করবেই।